কেন্দুয়া পৌরসভার ২৮ বছরের নেতৃত্বের ইতিহাসে ‎প্রশাসকের অধীনে শুরু হয়ে ফের প্রশাসকের হাতে


hasan প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ১২:৫২ অপরাহ্ন /
কেন্দুয়া পৌরসভার ২৮ বছরের নেতৃত্বের ইতিহাসে ‎প্রশাসকের অধীনে শুরু হয়ে ফের প্রশাসকের হাতে

নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর কেটে গেছে প্রায় তিন দশক। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পৌরসভাবাসী দেখেছে প্রশাসকের নেতৃত্ব, একাধিক মেয়র নির্বাচন, আওয়ামী লীগ-বিএনপির সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, একই প্রার্থীর একাধিকবার বিজয় এবং রাজনৈতিক পালাবদলের নানা অধ্যায়। ২০২৪ সালের পর নির্বাচিত মেয়রের পরিবর্তে বর্তমানে পৌরসভাটি আবারও প্রশাসকের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।

‎১৯৯৮ সালের ১০ আগষ্ট কেন্দুয়া পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে পৌরসভার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ৩০ মে ১৯৯৯ সালে। পৌরসভা প্রতিষ্ঠার সময় নির্বাচিত মেয়র নয়, প্রশাসকের নেতৃত্বেই কেন্দুয়া পৌরসভার যাত্রা শুরু হয়।  প্রতিষ্ঠার শুরুতেই কেন্দুয়া পৌরসভার প্রশাসক হিসেবে  আব্দুল হক ভূইয়া দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে কেন্দুয়া পৌরসভার প্রথম  নির্বাচিত মেয়র হিসেবে  কেন্দুয়া পৌর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন।  অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠার প্রশাসনিক পর্যায় পেরিয়ে নির্বাচিত মেয়রের নেতৃত্বে পৌরসভা পরিচালনার সময়েও আব্দুল হক ভূইয়ার নাম সামনে আসে। পরবর্তীতে কেন্দুয়া পৌরসভার নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দুই মেয়াদের দায়িত্ব পালন করেন দেলোয়ার হোসেন ভূইয়া দুলাল।

‎বর্তমানে কেন্দুয়া পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে । এটি ‘গ’ শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে যাত্রা শুরু করে “খ” শ্রেণীতে উন্নীত হয়।


‎কেন্দুয়া পৌরসভার ইতিহাসে ২০০৫ সালের নির্বাচন ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।  ওই নির্বাচনে মেয়র পদে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বিএনপির দুই প্রার্থী ছিলেন মো. দেলোয়ার হোসেন ভূইয়া ও সৈয়দ মাহমুদুল হক ফারুক; আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী ছিলেন আব্দুল হক ভূইয়া ও তাজিম উদ্দিন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন মো. জসিম উদ্দিন ভূইয়া। তখন পৌরসভার ভোটার ছিল ১৪ হাজার ৮১৯ জন এবং ভোটকেন্দ্র ছিল ৯টি।  দেলোয়ার হোসেন ভূইয়া দুলাল কেন্দুয়া পৌরসভার নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দুইবার দায়িত্ব পালন শেষে তিনি কেন্দুযা পৌরসভা নির্বাচন থেকে বিরত থাকেন।

‎ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে উপজেলা পরিষদের যাত্রা শুরুর কিছুকাল পর সেই পরিষেদর  দায়িত্ব পালনকারী দেলোয়ার হোসেন ভূইয়া দুলালের রাজনৈতিক পথচলা অবশ্য পৌরসভাতেই থেমে থাকেনি। পরবর্তী সময়ে তিনি কেন্দুয়া উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবেও নেতৃত্বে আসেন এবং কেন্দুয়া-আটপাড়া অঞ্চলের  রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে পরিচিতি পান।

‎পরবর্তীতে কেন্দুয়া পৌরসভার নেতৃত্বে আবারও পরিবর্তন আসে। পুনরায় পৌর মেয়র নির্বাচিত হন আব্দুল হক ভূইয়া।  ১৭ জানুয়ারি ২০১১ কেন্দুয়া পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত মেয়রের শপথ অনুষ্ঠিত হয়।

‎কেন্দুয়া পৌরসভার ওই নির্বাচনে আব্দুল হক ভূইয়া ও মজনুর রহমান খন্দকার মেয়র পদে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। নির্বাচনে তখনকার ক্ষমতাসীন দলের আব্দুল হক ভূইয়া ৫৭৬০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন।৷  ওই নির্বাচনে বিরোধীদলীয প্রার্থী মজনুর রহমান খন্দকার  পরাজিত হলেও ৩৯৭৫ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পান।  তবে ২০১১ সালের ১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত কেন্দুয়া পৌরসভা নির্বাচনে মজনুর রহমান খন্দকারের বিজয় খুবই সন্নিকটে  থাকলেও সে সময় নিজ দলীয় উল্লেখ্যযোগ্য কয়েকজন ব্যক্তির  কৌশলগত  গোপন বিরোধিতা বিদ্যমান ছিল। ওই নির্বাচনের ভোটের সমীকরণে দেখা যায় তৎকালীন মজনুর রহমানের  দিগদাইর নিজ কেন্দ্রের ভোটার ছিল ৬৪৩ জন।   তৎকালীন  পৌর নির্বাচনে মজনুর রহমানের নিজ কেন্দ্র দিগদাইরের  চেয়ে  আব্দুল হক ভূইয়ার নিজ কেন্দ্র আলীপুরের ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায়  তিন গুণের চেয়ে বেশি ১৮১৩ ভোট ।  মজনুর রহমান নিজ কেন্দ্র দিগদাইরে কাস্টিং ৫২২   ভোটের মধ্যে ৪৪৩ ভোট পান এবং আব্দুল হক ভূইয়া পান ৫৭ ভোট।  নিজ কেন্দ্রে সর্বোচ্চ ভোট পেলেও  প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থী আব্দুল হক ভূইয়ার নিজ কেন্দ্র আলীপুরে কাস্টিং  ১৬২১ ভোটের মধ্যে মজনুর  রহমান পান মাত্র ১৩০ ভোট । পৌরসভার অন্যান্য কেন্দ্রে মজনুর রহমান হাড্ডাহাড্ডি  লড়াইয়ে আশানুরূপ ভোট পেলেও একমাত্র আলীপুর কেন্দ্রের প্রাপ্ত ভোটের  হিসাব নিকাশেই বদলে দেয় প্রাপ্ত ভোটের সমীকরণ ফলে বিজয় বঞ্চিত হয় মজনুর রহমান খন্দকার ।  উডয় প্রার্থীর জয় পরাজয় নির্ধারিত হয়ে যায় আলীপুর কেন্দ্রের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধানে।  সে বার দ্বিতীয় বারের মত নির্বাচিত মেয়র হবার গৌরব অর্জন করেন আব্দুল হক ভূইয়া।

‎কেন্দুয়া পৌরসভার মেয়র  দেলোয়ার হোসেন ভূইয়া দুলালের দুই মেয়াদের দায়িত্ব পালনের  পর ২০১১ সালে আব্দুল হক ভূইয়ার পুনরায় পৌর নেতৃত্বে প্রত্যাবর্তন কেন্দুয়ার পৌর রাজনীতিতে দুই পরিবারের একটি উল্লেখযোগ্য  পালাবদল হিসেবে দেখা যায়। পরে কেন্দুয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য,কান্দিউড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান;কেন্দুয়া পৌরসভার প্রতিষ্ঠাকালীন প্রশাসক, সাবেক দুইবারের মেয়র আব্দুল হক ভূইয়া ২০১৫ সালের ২০শে নভেম্বর ৬২ বছর বয়সে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টায় ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেন।

‎কেন্দুয়া পৌর মেয়র আব্দুল হক ভূইয়ার মৃত্যুর পর পৌরসভার নির্বাচিত মেয়র হিসেবে  নতুন নেতৃত্বে আসেন আসাদুল হক ভূইয়া।

‎২০১৫ সালের পৌর নির্বাচন কেন্দুয়ার নির্বাচনী ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন আসাদুল হক ভূইয়া, বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম শফিক।  ৩০ ডিসেম্বর ২০১৫ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত আসাদুল হক ভূইয়া নৌকা প্রতীকে বিজয়ী হন।  তিনি ৭ হাজার ৭১২ ভোট পেয়ে বিজয়ী এবং তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শফিকুল ইসলাম শফিক ২ হাজার ৭৩৫ ভোট পেয়ে পরাজিত হন।  ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আব্দুল হক ভূইয়ার পর তাঁর পরিবারেরই নতুন প্রজন্মের আসাদুল হক ভূইয়া কেন্দুয়া পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন।

‎পরবর্তীতে একই লড়াইয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটে  দ্বিতীয়বারও  আসাদুল হক ভূইয়া মেয়র নির্বাচিত হন।  ২০১৫ সালের নির্বাচনের মতই পাঁচ বছর পর ২০২১ সালের পৌর নির্বাচনেও কেন্দুয়ার মেয়র পদে আবার মুখোমুখি হন আসাদুল হক ভূইয়া ও শফিকুল ইসলাম শফিক। এবারও ফলাফল যায় আসাদুল হক ভূইয়ার পক্ষে।

‎২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারি ইভিএমে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন মেয়র আসাদুল হক ভূইয়া নৌকা প্রতীকে ৯ হাজার ১৭৬ ভোট পেয়ে পুনর্নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শফিকুল ইসলাম শফিক ধানের শীষ প্রতীকে পান ২ হাজার ২৫৬ ভোট। ওই নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ১৬ হাজার ২৫৬ জন এবং ভোট দেন ১১ হাজার ৪৩২ জন। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আসাদুল হক ভূইয়া টানা দ্বিতীয়বারের মতো কেন্দুয়া পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে ২০১৫ ও ২০২১—দুই নির্বাচনেই আসাদুল হক  ভূইয়া ও শফিকুল ইসলামের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেন্দুয়ার পৌর নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত ধারাবাহিকতা হয়ে ওঠে।

‎কেন্দুয়া পৌরসভার নির্বাচিত মেয়রগণ দায়িত্ব পালন করলেও প্রয়াত মেয়র আব্দুল হক ভূইয়ার পরবর্তীতে   সাময়িক সময়ের জন্য ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন প্যানেল মেয়র আব্দুল কাইয়ূম ভূঁইয়া।

‎কেন্দুয়া পৌরসভার নেতৃত্বের ইতিহাসে ২০২৪ সাল আবারও বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আসাদুল হক ভূইয়া আর পৌর মেয়র পদে বহাল থাকেননি।

‎এরপর পৌরসভায় নির্বাচিত মেয়রের পরিবর্তে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। কেন্দুয়া পৌরসভার পৌর প্রশাসক হিসেবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমদাদুল হক তালুকদার দায়িত্ব পালন করেন। পর্যায়ক্রমে ইউএনও রিফাতুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করেন বর্তমানে ইউএনও সানজিদা চৌধূরী পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন।

‎১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার সময় যেমন প্রশাসকের হাতে কেন্দুয়া পৌরসভার যাত্রা শুরু হয়েছিল, প্রায় ২৬ বছর পর ২০২৪ সালে নির্বাচিত মেয়রের অধ্যায় শেষ হয়ে আবারও প্রশাসকের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে কেন্দুয়া  পৌরসভা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন করে পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায়  কেন্দুয়া পৌরসভা এখন নির্বাচিত মেয়রের নেতৃত্বে নয়, প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

‎কেন্দুয়া পৌরসভার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে  তিনটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় প্রথমত, প্রতিষ্ঠার পর প্রশাসক দিয়ে শুরু হলেও খুব দ্রুত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির নেতৃত্বে পৌরসভা পরিচালনার ধারা তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, আব্দুল হক ভূইয়া ও দেলোয়ার হোসেন ভূইয়া দুলাল—দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বে  পৌর রাজনীতিতে পালাবদল ঘটে। তৃতীয়ত, কেন্দুয়া পৌরসভার প্রায় তিন দশকের রাজনীতির ইতিহাসে প্রতিষ্ঠাতা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন ছাড়াও আব্দুল হক ভূইয়া দুইবার নির্বাচিত মেয়র ও  দেলোয়ার হোসেন ভূইয়া দুলাল দুইবার এবং প্রায় তিন দশকের কেন্দুয়া পৌরসভার কর্ণ ধার হিসেবে দেলোয়ার হোসেন ভূইয়া দুলাল দুইবার এবং আসাদুল হক ভূইয়া দুইবার নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

‎কেন্দুয়া পৌরসভা প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে প্রশাসক দ্বারা পরিচালিত হয় আর ২০২৪ সালের পর আবার প্রশাসকের হাতে পৌরসভার দায়িত্ব চলে যাওয়ায় কেন্দুয়া পৌরসভা তার ২৮ বছরের ইতিহাসে যেন আরেকটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।

‎১৯৯৮ সালে প্রশাসকের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা কেন্দুয়া পৌরসভা নির্বাচিত মেয়রের নেতৃত্বে দীর্ঘ সময় পার করে আবার প্রশাসকের হাতে ফিরেছে। এখন আগামীদিনের পৌরসভার নেতৃত্ব বিষয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—পরবর্তী নির্বাচনে কার হাতে যাবে কেন্দুয়া পৌরসভার নেতৃত্ব, আর সেই নেতৃত্ব কি পৌরসভার প্রায় তিন দশকের রাজনৈতিক ধারায় নতুন কোনো অধ্যায়ের সূচনা করবে?

 

(মাঈন উদ্দিন সরকার রয়েল, কেন্দুয়া (নেত্রকোণা)