কেন্দুয়া উপজেলার ১৩ ইউপির দুই দশকের নির্বাচনী হালচাল


hasan প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬, ৩:৩৬ অপরাহ্ন /
কেন্দুয়া উপজেলার ১৩ ইউপির দুই দশকের নির্বাচনী হালচাল

নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন গত দুই দশকে শুধু চেয়ারম্যান নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং স্থানীয় রাজনীতির শক্তি, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, পারিবারিক প্রভাব, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, দলীয় আনুগত্য ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের অবস্থান—সবকিছুরই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। ২০০৩, ২০১১, ২০১৬ ও ২০২২ সালের নির্বাচন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কেন্দুয়ার ইউনিয়ন রাজনীতিতে কখনো দলীয় পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক বড় হয়েছে, আবার কখনো দলীয় প্রতীক নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।

‎২০০৩ ও ২০১১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ছিল দলীয় প্রতীকের বাইরে। ফলে ওই সময় চেয়ারম্যান নির্বাচনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি, সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক প্রভাব, দীর্ঘদিনের জনসম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতাই ছিল জয়-পরাজয়ের অন্যতম প্রধান নিয়ামক।


‎আশুজিয়া ইউনিয়নে ২০১৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রফিকুল ইসলাম রফিক জয়ী হন। ২০২২ সালের নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মো. মঞ্জুর আলী। এতে দেখা যায়, দলীয় প্রতীকের নির্বাচনে মনোনীত প্রার্থীর পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীরও জয় পাওয়ার সুযোগ ছিল।

‎দলপা ইউনিয়নে ২০১৬ সালে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আমিনুর রহমান খান পাঠান চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০২২ সালে মো. শাহীন মিয়া জয়ী হন। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে নেতৃত্বের এই পরিবর্তন স্থানীয় ভোটের পরিবর্তনশীল সমীকরণের দৃষ্টান্ত।

‎গড়াডোবা ইউনিয়নে ২০০৩-২০১১ মেয়াদে বদরুনূর চৌধুরী লিপন চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০১১ সালে মোহাম্মদ কামরুজ্জামান খান সোহাগ দায়িত্ব নেন। ২০১৬ সালে মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বাবলু চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর ২০২২ সালের নির্বাচনে আবারও কামরুজ্জামান খান সোহাগ চেয়ারম্যান পদে ফিরে আসেন। ফলে এ ইউনিয়নে নেতৃত্বের পরিবর্তনের পাশাপাশি পুরনো নেতৃত্বের পুনরাগমনের ঘটনাও দেখা গেছে।

‎গণ্ডা ইউনিয়নে ২০১১-২০১৬ মেয়াদে মো. সঞ্জু মিয়া চেয়ারম্যান ছিলেন এবং ২০১৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে জয়ী হন। তবে ২০২২ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী হিসেবে পরিচিত মো. শহীদুল ইসলাম কল্যাণ স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এ ফলাফল দলীয় প্রতীকের বাইরে ব্যক্তিগত ভোট ও স্থানীয় সমর্থনের গুরুত্বকে সামনে আনে।

‎সান্দিকোনা ইউনিয়ন কেন্দুয়ার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার উদাহরণগুলোর একটি। আজিজুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে এই ইউনিয়নের নেতৃত্বে রয়েছেন। ২০২২ সালের নির্বাচনে তিনি ষষ্ঠবারের মতো চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তাঁর নির্বাচনী ইতিহাসে ১৯৮৩ সালে প্রথমবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন । মাঝখানে কয়েকটি নির্বাচন না করেও পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে নির্বাচিত হওয়া প্রমাণ করে, দীর্ঘদিনের জনসম্পৃক্ততা ও ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক ইউনিয়ন নির্বাচনে কতটা শক্তিশালী হতে পারে।

‎মাসকা ইউনিয়নের নির্বাচনী ইতিহাসেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পালাবদল। ২০০৩ সালে মতিউর রহমান চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।  পরবর্তীতে আবু তালেব ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালের নির্বাচনে আব্দুস সালাম বাঙালি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে মোস্তাফিজুর রহমান (খুকুমনি) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে নেতৃত্বে পরিবর্তন আনেন। পরে ২০২২ সালের নির্বাচনে আবার আব্দুছ ছালামা বাঙ্গালী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ফলে মাসকার রাজনীতিতে ব্যক্তি, স্থানীয় সমর্থন ও রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তন একাধিক নির্বাচনে দৃশ্যমান হয়েছে।

‎বলাইশিমুল ইউনিয়নে ২০১৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আলী আকবর তালুকদার মল্লিক জয়ী হন। ২০২২ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ফজলুর রহমান চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এতে দলীয় প্রার্থী থেকে স্বতন্ত্র নেতৃত্বে পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া যায়।

‎নওপাড়া ইউনিয়নে ২০০৩-২০১১ মেয়াদে মো. মাজহারুল ইসলাম তালুকদার রিপন চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০১১ সালে দায়িত্ব নেন মো. মাজহারুল ইসলাম মাজু। ২০১৬ সালে মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০২২ সালের নির্বাচনে অ্যাডভোকেট মো. সারোয়ার জাহান কাউসার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। অর্থাৎ দুই দশকে এই ইউনিয়নেও নেতৃত্বের একাধিক পরিবর্তন ঘটেছে।

‎কান্দিউড়া ইউনিয়নের  ২০০৩-২০১১ মেয়াদে চেয়ারম্যান ছিলেন আবুল কালাম আজাদ, মাঝখানে ভারপ্রাপ্ত মো. মিজানুর রহমান। পরবর্তী সময়ে নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে ২০১১ সালে আনোয়ারুল হক তালুকদার কনক । ২০১৬ সালে শহীদুল্লাহ্ কায়সার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।  ২০২২ সালের নির্বাচনে মো. মাহাবুব আলম বাবুল স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয়ের ঘটনা স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিটি ভোটের গুরুত্বকেও সামনে এনেছে।

‎চিরাং ইউনিয়নে মোছাঃ সালমা আক্তার ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালে  চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে  মো. মশিউর রহমান ভূঞা লিটন দায়িত্ব পালন করেন । ২০১৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মাহাবুবুল আলম খান চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০২২ সালে মো. এনামুল কবীর খান চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ফলে এ ইউনিয়নেও সময়ের সঙ্গে নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটেছে।

‎রোয়াইলবাড়ী-আমতলা ইউনিয়নে ২০০৩ সালে তওফিক আহম্মেদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১১ সালে আনিছুর রহমান দায়িত্ব নেন। ২০১৬ সালে এস এম ইকবাল রুমী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে মো. লুৎফর রহমান আকন্দ চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আসেন এবং ২০২২ সালের নির্বাচনে তিনিই বিজয়ী হন। একই ইউনিয়নে একাধিক নেতৃত্বের পরিবর্তনের পাশাপাশি একজন নতুন প্রার্থীর নির্বাচনীভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঘটনাও এখানে দেখা যায়।

‎পাইকুড়া ইউনিয়নে ২০১৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. হুমায়ুন কবীর চৌধুরী জয়ী হন। ২০২২ সালে মো. ইসলাম উদ্দিন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এই ইউনিয়নের ফলাফলও দেখায়, দলীয় প্রতীক থাকলেও স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী প্রার্থীরা নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারেন।

‎মোজাফফরপুর ইউনিয়নে ২০০৩-২০১১ মেয়াদে মজিবুর রহমান ভূঞা চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০১১ সালে এন,এ,এম জাহাঙ্গীর চৌধুরী দায়িত্ব নেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তবে ২০২২ সালে মুহাম্মদ জাকির আলম ভূঞা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ফলে দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের পর নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাবের চিত্রও এ ইউনিয়নে স্পষ্ট।

‎কেন্দুয়ার ১৩ ইউনিয়নের ২০১৬ সালের নির্বাচন ছিল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দলীয় প্রতীক চালুর পর ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী সরাসরি জয় পান মাত্র তিনটি ইউনিয়নে—গণ্ডা, সান্দিকোনা ও মোজাফফরপুর। কিন্তু আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয় পান আরও ছয়টি ইউনিয়নে—আশুজিয়া, দলপা, গড়াডোবা, নওপাড়া, রোয়াইলবাড়ী-আমতলা ও পাইকুড়ায়। অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী জয় পান চিরাং, বলাইশিমুল ও কান্দিউড়ায় এবং বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাসকায় জয় পান মোস্তাফিজুর রহমান।

‎অর্থাৎ ২০১৬ সালের ফলাফলে দলীয় প্রতীকের চেয়ে প্রার্থীর নিজস্ব অবস্থান ও স্থানীয় ভোটের সমীকরণ অনেক ক্ষেত্রেই বেশি কার্যকর হয়েছে। নৌকার সরাসরি জয় মাত্র তিনটি হলেও আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ বা বিদ্রোহী প্রার্থীদের জয় ছয়টি ইউনিয়নে পৌঁছায়। একইভাবে বিএনপি ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরাও চারটি ইউনিয়নে জয় পান।

‎২০২২ সালের নির্বাচনেও কেন্দুয়ার ইউনিয়ন পরিষদ রাজনীতিতে দলীয় প্রতীক ও ব্যক্তিগত ভোটের দ্বৈত প্রভাব দেখা যায়। ১৩ ইউনিয়নের মধ্যে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা জয় পান আটটিতে। অপর পাঁচটিতে জয় পান স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ফলে দলীয় প্রতীকের প্রভাব ২০১৬ সালের তুলনায় বেড়ে গেলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের শক্ত অবস্থান পুরোপুরি বিলীন হয়নি।

‎দুই দশকের নির্বাচনী ফলাফল পর্যালোচনা করলে কেন্দুয়ার ইউনিয়ন পরিষদ রাজনীতির একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এখানে দলীয় পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই সবসময় শেষ কথা নয়। কোনো ইউনিয়নে দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান বারবার ফিরে এসেছেন, কোথাও নতুন নেতৃত্ব পুরনো নেতৃত্বকে সরিয়ে দিয়েছে, আবার কোথাও দলীয় মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, পারিবারিক ও সামাজিক প্রভাব, স্থানীয় সংগঠন এবং ভোটারদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক—এসব বিষয়ও ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

‎এখন সেই পুরনো নির্বাচনী বাস্তবতার সঙ্গে নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হতে যাচ্ছে। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও দলীয় প্রতীক থাকছে না। ফলে ব্যালটে কোনো দলের প্রতীক না থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় প্রভাব, প্রার্থীদের দলীয় পরিচয়, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং নিজস্ব ভোটব্যাংক নির্বাচনী মাঠে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

‎কেন্দুয়ার গত দুই দশকের নির্বাচনী ইতিহাস তাই আসন্ন ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়—দলীয় প্রতীক না থাকলে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় সংগঠন, সামাজিক সম্পর্ক ও ভোটব্যাংকের গুরুত্ব আরও দৃশ্যমান হতে পারে। ২০০৩ ও ২০১১ সালের প্রতীকবিহীন নির্বাচনের অভিজ্ঞতা, ২০১৬ সালের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সাফল্য এবং ২০২২ সালের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয়—সবকিছু মিলিয়ে কেন্দুয়ার ১৩ ইউনিয়নে এবার মূল লড়াই হতে পারে ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি, জনপ্রিয়তা বনাম সংগঠন এবং স্থানীয় ভোটব্যাংক বনাম রাজনৈতিক সমর্থনের। আর সেই লড়াইয়ে কোন ইউনিয়নে পুরনো নেতৃত্ব টিকে থাকবে, কোথায় নতুন মুখের উত্থান হবে এবং কোথায় রাজনৈতিক দলের সমর্থন ছাড়াই প্রার্থীরা নিজেদের শক্তি প্রমাণ করবেন—সেটিই এখন কেন্দুয়ার ইউনিয়ন রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

(‎মাঈন উদ্দিন সরকার রয়েল,কেন্দুয়া (নেত্রকোণা)