‎কেন্দুয়ার সদরঘেঁষা কান্দিউড়া ইউপির ৫০ বছরের  নেতৃত্বের পালাবদল; সামনে প্রতীকবিহীন নির্বাচন


hasan প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬, ৫:১১ অপরাহ্ন /
‎কেন্দুয়ার সদরঘেঁষা কান্দিউড়া ইউপির ৫০ বছরের  নেতৃত্বের পালাবদল; সামনে প্রতীকবিহীন নির্বাচন

নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলা সদরসংলগ্ন ১০ নং কান্দিউড়া ইউনিয়ন শুধু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, দীর্ঘ পাঁচ দশকের নেতৃত্বের পালাবদলও ইউনিয়নটির রাজনৈতিক ইতিহাসকে করেছে বৈচিত্র্যময়। কখনো নির্বাচিত চেয়ারম্যান, কখনো ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব, আবার কখনো দলীয় প্রতীকের বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিজয়—সব মিলিয়ে কান্দিউড়ার নির্বাচনী ইতিহাসে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও স্থানীয় ভোটের সমীকরণ বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সামনে আবারও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, যেখানে দলীয় প্রতীক থাকছে না। ফলে অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সামাজিক অবস্থান ও নিজস্ব ভোটব্যাংকই এবার বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।

‎প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেও কান্দিউড়া সমৃদ্ধ। সারি সারি ফসলের ক্ষেত, ছোট নদী-খাল, সাঁকো, সুতি সাইডুলি ও পাটকুড়া নদীর মোহনা এবং গোগবাজারসংলগ্ন মনোরম পরিবেশ এ ইউনিয়নের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইউনিয়ন পরিষদের তথ্যানুযায়ী প্রায় ১৭ দশমিক ৩২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ইউনিয়নটিতে ২৩টি গ্রাম ও ১৮টি মৌজা রয়েছে। জনসংখ্যা ২১ হাজার ৫৪৫ জন। শিক্ষার হার ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ। প্রাচীন কবি কঙ্কের জন্মস্থান, খোজার দিঘি ও গোগবাজারের ত্রিবেণী ঘাটসহ রয়েছে ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান।

‎১৯৭২ সালে সদর উদ্দিন সরকার (বেজগাতি কুন্ডুলী)-এর মাধ্যমে কান্দিউড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের যে ধারাবাহিকতা শুরু হয়, তা পরবর্তী পাঁচ দশকে একাধিকবার নেতৃত্বের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। ১৯৭৩ সালে খুরশেদ উদ্দিন ভূঞা (বাদে আঠারবাড়ী), ১৯৭৪ সালে শামছুদ্দিন ভূঞা (ব্রাহ্মনজাত), ১৯৭৭ সালে সৈয়দ মাজহারুল হক (টেংগুরী আমলীতলা) এবং ১৯৮৩ সালে আবু সাদেক ভূঞা (দিগদাইর) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। আবু সাদেক ভূঞা পরপর দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন।

‎১৯৯২ সালে মো. আব্দুল হক ভূঞা (কান্দিউড়া) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯৮ সালে দায়িত্বে আসেন মো. দেলোয়ার হোসেন ভূঞা (দিগদাইর)। এরপর ১৯৯৯ সালে মো. কাঞ্চন মিয়া (তারাকান্দিয়া) এবং ২০০০ সালে মো. মোসলেম উদ্দিন (বেজগাতি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

‎ নির্বাচনী হালচাল বিবেচনায় কান্দিউড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ২০০৩ সালে। ওই সময় মো. আবুল কালাম আজাদ (তেতুলিয়া) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তাঁর কার্যকাল ছিল ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত। তবে তাঁর দায়িত্বকালের মাঝামাঝি সময়ে মো. মিজানুর রহমান (তারাকান্দিয়া) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে ০৯/০৫/২০০৪ থেকে ২৫/০৬/২০০৫ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর মো. আবুল কালাম আজাদ পুনরায় চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁর মেয়াদ ২০১১ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

‎২০১১ সালের নির্বাচনে আনোয়ারুল হক তালুকদার কনক (তারাকান্দিয়া) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তাঁর মেয়াদ ছিল ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। এরপর ২০১৬ সালের দলীয় প্রতীকের নির্বাচনে মো. শহীদুল্লাহ কায়সার (বেজগাতি কুন্ডুলী) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচন কেন্দুয়ার ইউনিয়ন পরিষদ রাজনীতিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে, কারণ দলীয় প্রতীক চালুর পরও সব ইউনিয়নে দলীয় মনোনীত প্রার্থীরা জয়ী হতে পারেননি; বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পান।

‎কান্দিউড়ায় ২০১৬ সালের নির্বাচনের ফলাফলও ছিল সেই পরিবর্তনের অংশ। মো. শহীদুল্লাহ কায়সার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে ইউনিয়নটির নেতৃত্বে নতুন পরিবর্তন আসে।

‎২০২২ সালের নির্বাচনে আবারও কান্দিউড়ায় দেখা যায় ভিন্ন সমীকরণ। মো. মাহাবুব আলম (দীঘলকুর্শা রাজিবপুর) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তাঁর দায়িত্বকাল ২০২২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরবর্তী সময়ে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে। ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত মো. হুমায়ুন দিলদার, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর থেকে বর্তমানে রুবেল মিয়া, উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

‎কান্দিউড়ার নির্বাচনী ইতিহাসে ২০১৬ ও ২০২২ সাল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৬ সালে দলীয় প্রতীক চালুর পরও কেন্দুয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পান। কান্দিউড়াতেও দলীয় প্রার্থিতার বাইরে স্থানীয় ভোটের সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০২২ সালে আবার মো. মাহাবুব আলমের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয় দেখিয়ে দেয়, দলীয় প্রতীক থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও নিজস্ব ভোটব্যাংকের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

‎এবার সেই সমীকরণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় প্রার্থীদের ব্যক্তিগত পরিচিতি, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক শক্তি, পারিবারিক প্রভাব ও ভোটারদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কই সামনে চলে আসবে।

‎কান্দিউড়ার পাঁচ দশকের নেতৃত্বের ইতিহাস তাই আসন্ন নির্বাচনের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—প্রতীক নয়, এবার প্রার্থীই হবে মূল পরিচয়। কে মানুষের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য, কার নিজস্ব ভোটব্যাংক কতটা শক্তিশালী এবং কে স্থানীয় সম্পর্ককে ভোটে রূপ দিতে পারবেন—কান্দিউড়ার আগামী নির্বাচনে সেই হিসাবই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে।

 

 

(মাঈন উদ্দিন সরকার রয়েল, কেন্দুয়া (নেত্রকোণা)