
রাজনীতিতে অনেকেই জয় দিয়ে পরিচিত হন। আবার কেউ কেউ পরিচিত হন প্রতিকূল সময়েও মাঠ না ছাড়ার রাজনৈতিক দৃঢ়তায়। নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার মাসকা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোঃ রেজাউল হাসান ভূঁইয়া ওরফে সুমন স্থানীয় রাজনীতিতে এমনই এক আলোচিত নাম।
মাসকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে তিনি ইতোমধ্যে দুইবার নির্বাচনী লড়াই করেছেন। দলের কঠিন সময়ে একবার বিএনপির দলীয় প্রতীক ধানের শীষে, আরেকবার বিএনপি দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না করলেও স্থানীয় বিএনপির সমর্থনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ঘোড়া প্রতীকে তিনি নির্বাচন করেছেন ।
কঠিন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দুই নির্বাচনেই জয় তাঁর হাতে আসেনি। কিন্তু পরাজয়ের পরও রাজনীতির মাঠ ছাড়েননি। বরং বর্তমানে তিনি মাসকা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এ কারণেই আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
মোঃ রেজাউল হাসান টসুমনের রাজনৈতিক পথচলার সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি ছিল ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন।
২৩ এপ্রিল ২০১৬ অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনের সময় প্রথমবারের মতো ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার শুরু হওয়ায় নির্বাচনের মাঠে নৌকা ও ধানের শীষের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছিল।
তখন মাসকা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির দলীয় প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নামেন রেজাউল হাসান ভূঁইয়া সুমন। তাঁর বিপরীতে ছিল তখনকার সময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আব্দুস সালাম বাঙ্গালী । একই সঙ্গে বিএনপি নেতা এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান খুকুমণি স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
ফলে সুমনের জন্য লড়াইটি ছিল উভয় সংকটাপন্ন শাখের করাতের মত – একদিকে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে, অন্যদিকে নিজের দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর বিরুদ্ধেও নির্বাচনী যুদ্ধ করতে হয়েছে ।
২০১৬ সালের সেই নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত মাসকা ইউনিয়নে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান খুকুমণি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সে সময় অবশ্য একই নির্বাচনে কেন্দুয়ার ১৩টি ইউনিয়নের ফলাফলে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীদের বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে। —মাত্র তিনটি ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থীরা জয়ী হন; ছয়টিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা জয় পান। অন্যদিকে বিএনপির তিনজন দলীয় প্রার্থী এবং মাসকায় একজন বিএনপি বিদ্রোহী প্রার্থী জয় পান।
এই ফলাফলই বলে দেয়, ২০১৬ সালের মাসকা ইউনিয়নের নির্বাচন ছিল নিছক একটি সাধারণ চেয়ারম্যান নির্বাচন নয়; এটি ছিল দলীয় প্রতীক, দলীয় বিদ্রোহ এবং ক্ষমতার রাজনীতির ত্রিমুখী সংঘাতের একটি কঠিন নির্বাচনী লড়াই। সেই নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে মাঠে থাকা সুমন জয় না পেলেও রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়েননি।
প্রথম নির্বাচনের পাঁচ বছর পর আবারও চেয়ারম্যান পদে লড়াইয়ে নামেন রেজাউল হাসান ভূঁইয়া। ৫ জানুয়ারি ২০২২ অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কেন্দুয়ায় বিএনপি দলীয় প্রতীকে চেয়ারম্যান প্রার্থী দেয়নি। মাসকা ইউনিয়নেও সুমন দলীয় প্রতীক ধানের শীষে নির্বাচন করেননি। তিনি স্থানীয় বিএনপির সমর্থনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেন। ফলাফলে তিনি পান ৪ হাজার ৩৩৩ ভোট। বিজয়ী আব্দুস সালাম বাঙালি নৌকা প্রতীকে পান ৬ হাজার ৬৬ ভোট। অর্থাৎ দলীয় প্রতীক ছাড়াই সুমন চার হাজারের বেশি ভোট পান। তাঁর অনুসারীদের কাছে এই ফলাফল ছিল ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভিত্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত ।
বাস্তবিক পক্ষে মাসকা ইউনিয়নে সুমনের দুই নির্বাচনের দিকে তাকালে দেখা যায়, দুটি নির্বাচনই ছিল ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার। ২০১৬ সালে তিনি ছিলেন বিএনপির দলীয় প্রতীকের প্রার্থী। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নৌকা এবং নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে ত্রিমখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাঁকে লড়তে হয়েছে।
আর ২০২২ সালে বিএনপি দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না করলেও তিনি স্থানীয় বিএনপির সমর্থন নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আবারও ভোটের মাঠে যান।
অর্থাৎ দুই নির্বাচনেই তাঁর প্রার্থী হওয়ার পেছনে ছিল ভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতি—কিন্তু অভিন্ন ছিল একটি বিষয়: চরম দুঃসময়ে তিনি নির্বাচনী মাঠে ছিলেন।
চেয়ারম্যান পদে দুইবার পরাজিত হলেও সুমনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেমে যায়নি। বরং সংগঠনের সঙ্গে থেকে বর্তমানে তিনি মাসকা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
রজপথের পরিক্ষিত সৈনিক সুমন নির্বাচনে জয় না পেলেও ইউনিয়ন পর্যায়ের রাজনৈতিক সংগঠনে তাঁর অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছেন তিনি।
দুইবার নির্বাচনী অভিজ্ঞতা, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং বর্তমানে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে সুমনের নাম এখন সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে এবারও আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে উঠি এসেছে ।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করছেন, দলের প্রতিকূল সময়ে নির্বাচনী মাঠে থাকার অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তীতে সাংগঠনিক নেতৃত্বে উঠে আসায় আগামীদিনে ভবিষ্যৎ চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে চুড়ান্ত পর্যায়ে দলীয় নেতাকর্মীদের আন্তরিক ভালোবাসায় এবার তাঁর গলায় বিজয়ের মালা শোভা পেতে পারে।
সম্প্রকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁকে মাসকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে চেয়ে বিভিন্ন পোস্ট ও প্রচারণা করছেন অনেকেই।
এলাকার প্রবীন অনেক রাজনীতিবীদ মতামত ব্যক্ত করে বলেছেন-রাজনীতিতে দুইবার নির্বাচনে পরাজিত হওয়া যেমন একটি বাস্তবতা, তেমনি দুইবার পরাজয়ের পরও সংগঠনের সঙ্গে টিকে থাকাও রাজনৈতিক বাস্তবতার আরেকটি দিক।
২০১৬ সালে ধানের শীষ নিয়ে কঠিন ত্রিমুখী লড়াই, ২০২২ সালে দলীয় প্রতীক ছাড়াই ঘোড়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা—দুই নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এখন তাঁর রাজনৈতিক সম্পদ।
মাসকা ইউনিয়নের নির্বাচনী বিভিন্ন ওয়ার্ড নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ জনগণ অভিমত প্রকাশ করে বলেছেন—এইবার সকল দলীয় নেতাকর্মীগণ স্ব স্ব অবস্থান থেকে আন্তরিক ভাবে সহযোগিতা ও আপামর জনসাধারণের ভালবাসা পেলে আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তৃতীয়বারের চেষ্টায় সর্বোপরি মাসকা ইউনিয়নের ভোটারদের ভালবাসার রায়ে পেলে চেয়ারম্যানের চেয়ার ছুঁতে পারার সম্ভাবনা রয়েছে রেজাউল হাসান ভূঁইয়া সুমনের । স্থানীয় পর্যায়ে ইউপি নির্বাচনে র আলোচনায় রেজাউল হাসান ভূঁইয়া সুমনকে নিয়ে ইতোমধ্যে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা নিয়ে একটি আলোচনা চলমান রয়েছে -নির্বাচনে হেরেছেন, কিন্তু মাঠ ছাড়েননি। সচেতনন মহলের অনেকেই বলছেন- আর সেই কারণেই মাসকার আগামী দিনের ইউনিয়ন পরিষদ রাজনীতিতে রেজাউল হাসান ভূঁইয়া সুমনের নামটি আসন্ন ইউপি নির্বাচনের আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবেই। তবে রাজনৈতিক মাঠে দীর্ঘদিন টিকে থাকার অন্যতম পরিচয় হলো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মাঠ না ছাড়ার মানসিকতা। নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার ৭নং মাসকা ইউনিয়নের বিএনপির সভাপতি মোঃ রেজাউল হাসান ভূঁইয়া ওরফে সুমনকে ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে এমনই একটি রাজনৈতিক পথচলার আলোচনা রয়েছে।
দুইবার নির্বাচনে পরাজিত হয়েও রাজনীতির মাঠ না ছাড়ার কারণে সুমনের অনুসারীদের কাছে তাঁর রাজনৈতিক পথচলার সবচেয়ে বড় পরিচয়—“হারলেও থামেননি, মাঠ ছেড়ে যাননি।”
আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তাই মাসকার রাজনীতিতে আলোচনার একটি নাম হয়ে উঠছে রেজাউল হাসান ভূঁইয়া সুমন।
( মাঈন উদ্দিন সরকার রয়েল,কেন্দুয়া-নেত্রকোনা)
আপনার মতামত লিখুন :