‎কেন্দুয়ার রোয়াইলবাড়ির পাঁচ দশকের নির্বাচনী ইতিহাস; নেতৃত্ব পরিবর্তনের নেপথ্য কাহিনী কি?


hasan প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬, ১:৪৮ পূর্বাহ্ন /
‎কেন্দুয়ার রোয়াইলবাড়ির পাঁচ দশকের নির্বাচনী ইতিহাস; নেতৃত্ব পরিবর্তনের নেপথ্য কাহিনী কি?

বৃহত্তর ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার অন্যতম ১২ নং রোয়াইলবাড়ী আমতলা ইউনিয়ন। ঐতিহ্যবাহী রোয়াইলবাড়ী দুর্গ, কৃষি ও গ্রামীণ জনপদকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই ইউনিয়নের রাজনৈতিক ইতিহাসও দীর্ঘ। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে এ ইউনিয়নের নেতৃত্বে এসেছেন বিভিন্ন ব্যক্তি। তবে সাম্প্রতিক দুই দশকের নির্বাচনেরর ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দলীয় সমর্থন বা দলীয় প্রতীকের চেয়ে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ ও বিদ্রোহী প্রার্থিতার প্রভাব এখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


‎এ ইউনিয়নের নির্বাচন মানেই যেন শুধু দলীয় প্রতীক কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের লড়াই নয়; বরং দীর্ঘদিনের নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এখানে ব্যক্তি ইমেজ, এলাকাভিত্তিক ভোটের সমীকরণ, স্থানীয় প্রভাব এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ বিভাজনের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে প্রতীয়মান হয়। স্বাধীনতার পর থেকে এ ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের ধারাবাহিক ইতিহাস, বিভিন্ন নির্বাচনের ফলাফল এবং সরকারি নথিতে থাকা জনপ্রতিনিধিদের তথ্য বিশ্লেষণ করলে এমন একটি স্বতন্ত্র নির্বাচনী প্রবণতা চোখে পড়ে।


‎স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে রোয়াইলবাড়ী আমতলা ইউনিয়নের রাজনীতিতে একের পর এক নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটেছে। কখনো প্রবীণ নেতৃত্ব, কখনো নতুন মুখ, কখনো দলীয় পরিচয়, আবার কখনো দলীয় প্রতীকের বাইরে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা—সব মিলিয়ে এই ইউনিয়নের নির্বাচনী ইতিহাস গড়ে উঠেছে নিজস্ব এক স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। দীর্ঘ সময়ের চেয়ারম্যানদের তালিকা, বিভিন্ন নির্বাচনের ফলাফল এবং জনপ্রতিনিধিত্বের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রোয়াইলবাড়ী আমতলায় কোনো একক ব্যক্তি বা পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক আধিপত্যের চিত্র স্পষ্ট নয়; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবারই ভোটাররা তাদের ভোটের রায়ে নেতৃত্ব বদলেছেন। পুরনো নেতৃত্ব বদলিয়ে বার বার নতুন নেতৃত্ব এনেছেন।

‎স্বাধীনতার পর ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম দায়িত্ব পালন করেন মো. আব্দুল হামিদ বেপারী। তাঁর দায়িত্বকাল ১৯৭১ থেকে ১৯৭৩ সাল। এরপর ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৬ সালে আলী আহম্মদ, ১৯৭৭ থেকে ১৯৮০ সালে জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ, ১৯৮১ থেকে ১৯৮২ সালে আলিম উদ্দিন আহম্মেদ, ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সালে আইন উদ্দিন আহম্মেদ, ১৯৮৮ থেকে ১৯৯১ সালে পুনরায় আলিম উদ্দিন আহম্মেদ এবং ১৯৯২ থেকে ১৯৯৩ সালে আবুল হাসেম ভূঞা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৯৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন অ্যাডভোকেট মো. নুরুল আলম।উল্লেখ্য আলিম উদ্দিন আহম্মেদ ও এডভোকেট মোঃ নুরুল আলম দুই মেয়াদে চেয়ারম্যান ছিলেন।

‎এই দীর্ঘ তালিকার মধ্যেই একটি ঐতিহাসিক ব্যতিক্রম রয়েছে। আলিম উদ্দিন আহম্মেদ ও এডভোকেট মোঃ নুরুল আলম দুই মেয়াদে দুইবার করে পৃথক সময়ে ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন—। রোয়াইলবাড়ী আমতলা ইউনিয়নে স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত একই ব্যক্তির দুই পৃথক মেয়াদে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আলিম উদ্দিন আহম্মেদই ও এডভোকেট মোঃ নুরুল আলম এই দুজন নজির সৃষ্টি করেছিলেন। অর্থাৎ রোয়াইলবাড়ী আমতলা ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বে ১৯৭১ সালে পর থেকে ২০২৬ সাল এই পাঁচ দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসে আলীম উদ্দিন ও এডভোকেট মোঃ নুরুল আলম ব্যতীত চেয়ারম্যান পদে ধারাবাহিকভাবে দুই মেয়াদে বা পৃথক মেয়াদেও দুইবার এই দুইজন ব্যতীত অন্য ব্যক্তির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন কিংবা আধিপত্যের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। অর্থাৎ প্রতিবারই রোয়াইলবাড়ী আমতলা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যানের পরিবর্তন ঘটে।

‎১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ইউনিয়নের নেতৃত্বে আবার পরিবর্তনের ধারা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এডভোকেট নুরুল আলম ৯৩ এর উপ নির্বাচনে প্রথম চেয়ারম্যান হন এবং উনি ৯৬ এ নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো চেয়ারম্যান হন। ৯৩ থেকে ২০০২ পর্যন্ত টানা দুইবার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর বিএনপি সরকার ক্ষমতাকালীন সময়ে ২০০৩ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে চেয়ারম্যান হন তওফিক আহম্মেদ। তাঁর দায়িত্বকাল ছিল ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত। একই নির্বচনে বিএনপি নেতা মো. মিজানুর রহমান খান কায়সার চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। ২০০৩ সালের নির্বাচনও ইউনিয়নের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

‎২০১১ সালের নির্বাচনে এস এম ইকবাল রুমিকে পরাজিত করে চেয়ারম্যান হন আনিছুর রহমান বিপ্লব । তাঁর দায়িত্বকাল ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। এ নির্বাচচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে আদালতে মামলা পর্যন্ত করেন পরাজিত প্রার্থী।

‎পরবর্তীতে বিগত নির্বাচনে পরাজিত হয়েও মাঠ ছাড়েস নি এস,এম ইকবাল রুমি। জনগণের সাথে তার সম্পর্ক আরও গভীর করে তোলে। ফলে ২০১৬ সালের নির্বাচন রোয়াইলবাড়ী আমতলা ইউনিয়নের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন আনে। ওই নির্বাচনে এস এম ইকবাল রুমী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এই জয় শুধু একজন প্রার্থীর জয় ছিল না; এটি ছিল দলীয় প্রতীকের বাইরে স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতার একটি বড় প্রকাশ। পরাজিত হয়েও মাঠ না ছেড়ে বিশেষ করে সরাসরি মানুষের সঙ্গে প্রার্থীর যোগাযোগ, পারিবারিক পরিচিতি, সামাজিক সম্পর্ক, এলাকার উন্নয়ন, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে জনগণের সাথে সম্পৃক্ত থেকে এস এম ইকবাল রুমির বিজয়; রোয়াইলবাড়ী আমতলার ২০১৬ সালের ফলাফল সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসে।

‎পরবর্তীতে এস এম ইকবাল রুমীর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণ ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার কারণে দিন দিন জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে থাকে। রোয়াইলবাড়ী আমতলা ইউনিয়নের বিগত নির্বাচনে অর্থাৎ ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন মেম্বার পদে তৃতীয় লিঙ্গের বিশেষ করে . শিশু হিজরার জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া রোয়াইলবাড়ী আমতলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়। গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় তৃতীয় লিঙ্গের একজন ব্যক্তির ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হয়ে পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করা কেবল একটি নির্বাচনী ঘটনা নয়; এটি স্থানীয় ভোটারদের স্বাধীন পছন্দ সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

‎২০১৬ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিজয়ের পর ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন রোয়াইলবাড়ী আমতলার রাজনৈতিক চরিত্রকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। ইউপি নির্বাচন-২০২১-এর পঞ্চম ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ছিলেন শেখ নাজমুল হক। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মো. লুৎফর রহমান আকন্দ। ফলাফলে লুৎফর রহমান আকন্দ ৫ হাজার ৮৩৯ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নৌকার প্রার্থী শেখ নাজমুল হক পান ৫ হাজার ৬৬৫ ভোট। সাবেক চেয়ারম্যান এস এম ইকবাল রুমী আনারস প্রতীকে পান ২ হাজার ৬ ভোট। ফলে লুৎফর রহমান আকন্দ মাত্র ১৭৪ ভোটের ব্যবধানে নৌকার প্রার্থীকে পরাজিত করেন।

‎২০২২ সালের ৫ জানুয়ারির এই ১৭৪ ভোটের ব্যবধানই রোয়াইলবাড়ী আমতলার নির্বাচনী রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলোর একটি। কারণ এখানে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান ছিল অত্যন্ত কম, অথচ একই নির্বাচনে তৃতীয় অবস্থানে থাকা সাবেক চেয়ারম্যানও দুই হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন। ফলে ভোটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ একাধিক প্রার্থীর মধ্যে ভাগ হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সামান্য ব্যবধানই চেয়ারম্যান নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে। এই ফলাফল রোয়াইলবাড়ী আমতলা ইউনিয়নের স্থানীয় পর্যায়ে ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক, প্রার্থীর নিজস্ব গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক বিভাজনের গুরুত্বকে সামনে নিয়ে আসে।

‎রোয়াইলবাড়ী আমতলার ২০১৬ ও ২০২১ সালের দুটি নির্বাচন পাশাপাশি রাখলে আরও একটি শক্তিশালী প্রবণতা দেখা যায়—টানা দুই নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের বাইরে থাকা প্রার্থী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। এমন কি ২০১১ সালেও তৎকালীন ক্ষমতাসীণ দলের সমর্থিত প্রার্থী ও অপর প্রার্থীকে পরাজিত করে বিএনপি নেতা আনিছুর রহমান বিপ্লব চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়। ২০১৬ সালে এস এম ইকবাল রুমী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন; ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত ২০২১ সালের নির্বাচনের পঞ্চম ধাপো ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকা প্রার্থীকে হারিয়ে স্বতন্ত্র লুৎফর রহমান আকন্দ চেয়ারম্যান হন।
‎রোয়াইলবাড়ি আমতলা ইউনিয়নের বিগত দুই দশকের নির্বাচন পর্যালোচনা করলে এখানেই প্রশ্ন আসে—দলীয় প্রার্থীরা কি দলীয় কোন্দলের কারণে পরাজিত হয়েছেন, নাকি ব্যক্তিগত ইমেজ ও এলাকাভিত্তিক ভোটের সমীকরণই বড় ভূমিকা রেখেছে? রোয়াইলবাড়ী আমতলার ফলাফল একক কোনো উত্তর দেয় না; বরং দুই ধরনের রাজনৈতিক শক্তির সমান্তরাল উপস্থিতি দেখায়। একদিকে দলীয় প্রতীক, অন্যদিকে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা। ২০২১ সালে নৌকা ও ঘোড়ার ব্যবধান মাত্র ১৭৪ ভোট হওয়া এবং একই নির্বাচনে ইকবাল রুমীর দুই হাজারের বেশি ভোট পাওয়া দেখায়, ভোটারদের পছন্দ একক কোনো রাজনৈতিক ধারায় আবদ্ধ ছিল না।

‎পর্যালোচনায় দেখা যায়,রোয়াইল বাড়ি আমতলা ইউনিয়নের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম, বাজার, পাড়া-মহল্লা ও সামাজিক গোষ্ঠীর নিজস্ব ভোটের সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একজন প্রার্থী কোনো একটি এলাকায় শক্তিশালী হলেও অন্য এলাকায় তাঁর অবস্থান দুর্বল হতে পারে। আবার দলীয় মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থী পুরো দলের ভোট পেলেও বিদ্রোহী প্রার্থী একই রাজনৈতিক বলয়ের ব্যক্তিগত সমর্থকদের একটি অংশ নিজের দিকে টেনে নিতে পারেন। রোয়াইলবাড়ী আমতলার ২০২২সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল সেই সম্ভাব্য সমীকরণের একটি স্পষ্ট উদাহরণ তৈরি করেছে। নৌকা ও ঘোড়ার মধ্যে মাত্র ১৭৪ ভোটের ব্যবধান এবং তৃতীয় প্রার্থীর উল্লেখযোগ্য ভোটপ্রাপ্তি প্রমাণ করে, এখানে প্রতিটি ভোটারের নিজস্ব পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন এমনকি ভোটের রাজনৈতিক মূল্য ছিল অত্যন্ত বেশি। ফলে রোয়াইলবাড়ী আমতলার নির্বাচনকে বরং ‘দল বনাম ব্যক্তি’ নয়, ‘দলীয় পরিচয় ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার সম্মিলিত প্রতিযোগিতা’ হিসেবে দেখা যায়।

‎রোয়াইল বাড়ি আমতলা ইউনিয়নের ২০২২ সালের জনস্বার্থ বিষয়ের একটি ঘটনা থেকে আরেকটি দিকও সামনে আসে। রোয়াইলবাড়ী-আঠারবাড়ী সড়কের তাঁতিপাড়া এলাকায় পুরোনো একটি সেতু নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর তৎকালীন চেয়ারম্যান এস এম ইকবাল রুমী সেটি নিলামে বিক্রি করেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রকাশ। ।পরে নতুন লুৎফুর রহমান আকন্দ ব্যক্তিগত অর্থে প্রায় ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে বাঁশের সেতু নির্মাণ করে দেন বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানায় ; স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও জনসম্পৃক্ততা কীভাবে মানুষের কাছে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি তৈরি করতে পারে, এই ঘটনাও তার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচনায় আসে।

‎রোয়াইলবাড়ী আমতলার পাঁচ দশকের ইতিহাসে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো চেয়ারম্যান পদে নেতৃত্বের ঘন ঘন পরিবর্তন। ২০০৩ সালে তওফিক আহম্মেদ, ২০১১ সালে আনিছুর রহমান, ২০১৬ সালে এস এম ইকবাল রুমী এবং ২০২১ সালের নির্বাচনে লুৎফর রহমান আকন্দ চেয়ারম্যান হন। অর্থাৎ ২০০৩ সালের পর থেকে পরপর প্রতিটি নির্বাচনী চক্রে চেয়ারম্যান পরিবর্তিত হয়েছে। এমনকি স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা থেকে স্পষ্ট হয়,চেয়ারম্যান পদে রোয়াইলবাড়ী আমতলা ইউনিয়নটি কোনো একক ব্যক্তির দীর্ঘস্থায়ী নির্বাচনী দুর্গে পরিণত হয়নি।

‎অন্যদিকে ১৯৭১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চেয়ারম্যান হিসেবে যাদের নাম পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে আলিম উদ্দিন আহম্মেদ ও এডভোকেট মোঃ নুরুল আলম এই জন দুই পৃথক সময়ে দুইবারের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। এই দুইজনের বাইরে একই ব্যক্তির দুই পৃথক মেয়াদে চেয়ারম্যান থাকার নজির নেই। ফলে স্বাধীনতার পর রোয়াইলবাড়ী আমতলা ইউনিয়নের রাজনৈতিক ইতিহাসে পুনর্নদায়িত্ব পালনের সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টান্ত আলিম উদ্দিন আহম্মদ ও এডভোকেট মোঃ নুরুল আলমের সময়কালেই সীমাবদ্ধ। এছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো তখনকার সময়ে শরীফ কায়সার রাজা একজন জনপ্রিয় চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ছিলেন।

‎এই ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—চেয়ারম্যান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইউনিয়নের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ধরনও বদলেছে। একসময় প্রবীণ ও দীর্ঘদিনের স্থানীয় নেতৃত্ব, পরে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব, এরপর দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত প্রার্থী এবং সবশেষে দলীয় মনোনয়নের বাইরে থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থীর জয়—সবই এই ইউনিয়নের নির্বাচনী সংস্কৃতির অংশ হয়েছে।

‎২০২৪ সালে লুৎফর রহমান আকন্দকে চেয়ারম্যান হিসেবে থাকলেও একই বছরের ২৭ নভেম্বর থেকে রহিমা আক্তারকে প্রশাসক হিসেবে সরকারি ভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০২১ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত লুৎফর রহমান আকন্দের মেয়াদ-বর্তমান সময়ে ইউনিয়নের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন হয়েছে ।

‎পাঁচ দশকের এই ইতিহাস তাই শুধু চেয়ারম্যানদের নামের তালিকা নয়; এটি রোয়াইলবাড়ী আমতলার ভোটারদের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বেরও একটি প্রতিচ্ছবি। এখানে কোনো একটি দল বা প্রতীক চিরস্থায়ীভাবে ভোটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেনি। একই সঙ্গে কোনো একজন চেয়ারম্যানও দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচনী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। বরং সময়ের সঙ্গে ভোটাররা নেতৃত্ব পরিবর্তন করেছেন, নতুন মুখকে সুযোগ দিয়েছেন এবং প্রয়োজনে দলীয় প্রতীকের বাইরে গিয়ে প্রার্থী বেছে নিয়েছেন।

‎বিশেষ করে বিগত দুই দশকের নির্বাচনের ২০০৩, ২০১১, ২০১৬ ও ২০২১ সালের ধারাবাহিক ফলাফল সবচেয়ে বেশি তাৎপর্য বহন করে। পরপর দুই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিজয় দেখিয়েছে, রোয়াইলবাড়ী আমতলায় দলীয় প্রতীক গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা একমাত্র নির্বাচনী শক্তি নয়। ব্যক্তিগত ইমেজ, স্থানীয় যোগাযোগ, সামাজিক অবস্থান, নিজস্ব ভোটব্যাংক, দলীয় সংগঠনের ঐক্য এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ভোট ভাগাভাগি—সবকিছু মিলিয়েই এখানে নির্বাচনের ফল তৈরি হয়।

‎আর ২০২১ সালের মাত্র ১৭৪ ভোটের ব্যবধান যেন সেই বাস্তবতারই প্রতীক। এই ইউনিয়নে কয়েকশ ভোটের রাজনৈতিক হিসাবও যেখানে চেয়ারম্যানের আসন নির্ধারণ করতে পারে, সেখানে প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও এলাকাভিত্তিক ভোটের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীর পাশে একই রাজনৈতিক বলয়ের স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড়ালে সংগঠনের ভোট বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও নির্বাচনী ফলকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

‎স্বাধীনতার পর থেকে রোয়াইলবাড়ী আমতলা ইউনিয়নের নির্বাচনী ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যকে তাই এক কথায় বলাই যায়—পরিবর্তন। চেয়ারম্যান বদলেছে, ভোটের সমীকরণ বদলেছে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলেছে, জনপ্রতিনিধিত্বের ধরন বদলেছে; কিন্তু রোয়াইলবাড়ী আমতলা ইউনিয়নের ভোটারদের হাতে নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার ক্ষমতার ধারাটি অব্যাহত রয়েছে। পাঁচ দশকের এই ইতিহাস বলে দেয়, রোয়াইলবাড়ী আমতলায় শুধু দলীয় প্রতীক দিয়ে নির্বাচনের ফল নিশ্চিত করা যায়নি; বরং ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, এলাকা ও রাজনৈতিক সংগঠনের সম্মিলিত শক্তিই বারবার নির্ধারণ করেছে ইউনিয়নের নেতৃত্বের ভাগ্য।

‎রোয়াইলবাড়ী আমতলার নির্বাচনী ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাই একটি প্রশ্নের জন্ম দেয়—এখানে ভোট কি দলের, নাকি মানুষের? গত কয়েক দশকের ফলাফল বলছে, দলীয় প্রতীক ভোটের মাঠে শক্তিশালী হলেও শেষ সিদ্ধান্ত অনেক সময় চলে গেছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় সম্পর্ক ও ভোটের সূক্ষ্ম সমীকরণের হাতে। আর সেই কারণেই পাঁচ দশক পরও এই ইউনিয়নের নির্বাচন স্থানীয় রাজনীতির একটি আলাদা পাঠ হয়ে আছে।

‎এবার দেখার বিষয় আসন্ন ইউপি নির্বাচনে রোয়াইলবাড়ী আমতলা ইউনিয়নের পাঁচ দশকের নির্বাচনী ইতিহাস বহাল থাকবে নাকি নতুন ধারর সূচনা হবে। ভোটারদের পছন্দের প্রার্থী নির্বাচিত হোক এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।

 

‎(মাঈন উদ্দিন সরকার রয়েল, কেন্দুয়া (নেত্রকোণা)