‎কেন্দুয়ায় আড়াই বছর ধরে বাড়ি ছাড়া দম্পতি,বাড়িতে গেলেই হত্যার হুমকি।।


hasan প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ৩:৩২ অপরাহ্ন /
‎কেন্দুয়ায় আড়াই বছর ধরে বাড়ি ছাড়া দম্পতি,বাড়িতে গেলেই হত্যার হুমকি।।

নিজের বাড়ি ও জমি থাকা সত্ত্বেও প্রায় আড়াই বছর ধরে ভাড়া ঘরে বসবাস করছেন নেত্রকোনার কেন্দুয়ার এক দম্পতি। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে দুই দফা হামলা, গুরুতর জখম, ভাঙচুর ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে মামলা হয়েছে। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে চার্জশিটও দিয়েছে। কিন্তু মামলার বাদী আঃ বারেকের অভিযোগ, মামলার সব আসামি জামিনে থাকার সুযোগে তাঁদের বসতভিটা এখনো দখলে রেখেছেন এবং বাড়িতে ফিরতে গেলে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ফলে নিজের বাড়ি ছেড়ে মাসিক এক হাজার টাকা ভাড়ায় ছোট্ট একটি ঘরে দিন কাটছে তাঁদের।

‎ভুক্তভোগী দম্পতি বর্তমানে কেন্দুয়া পৌর সদরের কমলপুর এলাকায় একটি ছোট ঘরে বসবাস করছেন। আঃ বারেকের দাবি, প্রায় আড়াই বছর ধরে এভাবেই স্ত্রীকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে ভাড়া দিয়ে থাকতে হচ্ছে তাঁদের।

‎মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ও চার্জশিট সূত্রে জানা যায়, আঃ বারেক ও মামলার আসামিরা একই এলাকার পাশাপাশি বাড়ির বাসিন্দা। জমি-জমা নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এর আগে ওই বিরোধের জেরে বাদী মামলার কয়েকজন আসামির বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অভিযোগের জেরে আসামিরা বাদী ও তাঁর ভাগ্নে সোহাগের ওপর ক্ষিপ্ত হন এবং তাঁদের মারধরের সুযোগ খুঁজতে থাকেন।

‎এর ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মাছিয়ালী গ্রামের একটি বাড়িতে প্রথম হামলার অভিযোগ ওঠে।

‎মামলার এজাহারে আঃ বারেক অভিযোগ করেন, আবুল হাসেম, হোসেন, খোকন, হক মিয়া, মামুন, জাকির হোসেনসহ কয়েকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁর ভাগ্নে সোহাগের বাড়িতে প্রবেশ করে তাঁকে ঘেরাও করেন। এরপর রড ও রামদা দিয়ে সোহাগের মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়।

‎তদন্ত কর্মকর্তার চার্জশিটেও প্রথম ঘটনাস্থলে সোহাগকে মারধরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এজাহারে বর্ণিত হামলার সঙ্গে চার্জশিটে বর্ণিত অস্ত্র ও আঘাতের বিবরণে কিছু পার্থক্য রয়েছে।

‎প্রথম হামলায় আহত সোহাগকে চিকিৎসার জন্য কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে একই দিন সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে দামিনা এলাকায় দ্বিতীয় দফায় হামলার অভিযোগ করেন আঃ বারেক।

‎চার্জশিটে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, দামিনা এলাকায় আগে থেকে রামদা, লোহার শাবল ও রড নিয়ে অবস্থান করা আবুল হাসেম, হোসেন, খোকন, হক মিয়া, মামুন, জাকির হোসেন ও আবুল কাশেম অটোরিকশার গতিরোধ করেন। আবুল হাসেম ও খোকন বাদীকে টানাটানি করে অটোরিকশা থেকে রাস্তায় ফেলে দেন বলে তদন্তে উঠে আসে।

‎এরপর আবুল হাসেম শাবল দিয়ে বাদীর মাথায় আঘাত করেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে। হোসেন ও খোকন রামদা দিয়ে তাঁর দুই পায়ে কোপ মারেন বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এতে বাদীর হাত ও পায়ে গুরুতর জখম হয় বলে চিকিৎসা সনদে উল্লেখ রয়েছে।

‎পরে স্থানীয়দের সহায়তায় আঃ বারেক ও সোহাগকে কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা আঃ বারেককে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে তাঁর চিকিৎসা নেওয়ার তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে। সোহাগ হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে বহির্বিভাগ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে যান বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

‎এজাহারে আঃ বারেক তাঁর বসতঘরের টিনের বেড়া ও দরজা ভাঙচুর করে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি এবং ঘর থেকে প্রায় ৪০ হাজার টাকা মূল্যের মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছিলেন।

‎তবে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. জিয়াউল হকের চার্জশিটে ভাঙচুরের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকালে আসামিরা ঘরে ঢুকে বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও চার্জশিটে বলা হয়েছে।

‎এ কারণে বাদীর করা দণ্ডবিধির ৩৮০ ধারার চুরির অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ওই ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি। একইভাবে এজাহারে থাকা ৪৪৮ ধারার অভিযোগও তদন্তে প্রমাণিত হয়নি বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

‎ঘটনার এক সপ্তাহ পর ৮ ডিসেম্বর ২০২৩ কেন্দুয়া থানায় মামলা করেন আঃ বারেক। মামলার নম্বর ০৩, তারিখ ০৮/১২/২০২৩ এবং জিআর নম্বর ৩৬০/২০২৩।

‎মামলার তদন্ত শেষে ১৬ মার্চ ২০২৪ কেন্দুয়া থানার এসআই মো. জিয়াউল হক আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। চার্জশিটে আবুল হাসেম, হোসেন, খোকন, হক মিয়া, মামুন, জাকির হোসেন, আবুল কাশেম, কোহিনূর, হোসনা আক্তার ও নিলুফা—এই ১০ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৭, ৩৪১, ৩২৩, ৩২৫, ৩২৬, ৩০৭, ৪২৭, ৫০৬(২) ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে বলে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন।

‎চার্জশিটে আরও বলা হয়েছে, আহত আঃ বারেক ও সোহাগের চিকিৎসা-সংক্রান্ত সনদপত্র সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং সাক্ষীদের ১৬১ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে খসড়া মানচিত্র ও সূচিপত্র প্রস্তুত করা হলেও কোনো আলামত উপস্থাপন না হওয়ায় জব্দ করা সম্ভব হয়নি বলে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন।

‎চার্জশিটের সংযুক্ত তথ্য অনুযায়ী, আবুল হাসেম ও খোকনের বিরুদ্ধে অতীতের কয়েকটি মামলার তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে। এর মধ্যে ২০০৬ সালের একটি মামলায় মারামারি, অনধিকার প্রবেশ ও হত্যাচেষ্টার ধারাসহ অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। খোকনের বিরুদ্ধে ২০০৫, ২০০৭ ও ২০১৮ সালের কয়েকটি মামলার তথ্যও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।


‎আঃ বারেকের দাবি, মামলার চার্জশিট হলেও তাঁর পরিবারের পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। নিজের বাড়ি ও জায়গা বর্তমানে বিবাদীদের দখলে রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। বাড়িতে গেলে তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।