‎বেতনহীন মফস্বল সাংবাদিকতা: দেশসেবার আড়ালে কঠিন বাস্তবতা


hasan প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ৪:৩১ পূর্বাহ্ন / ০
‎বেতনহীন মফস্বল সাংবাদিকতা: দেশসেবার আড়ালে কঠিন বাস্তবতা

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাংবাদিকতা করেন এমন অসংখ্য মফস্বল সাংবাদিক। তাঁদের অনেকেই নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ করেন, রাত-বিরাতে ঘটনাস্থলে ছুটে যান, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, হাসপাতাল, আদালত ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সংবাদ তৈরি করেন। কিন্তু এই দায়িত্বের বিপরীতে অধিকাংশ মফস্বল সাংবাদিকের জন্য থাকে না কোনো নির্দিষ্ট বেতন।

‎
‎একজন মফস্বল সাংবাদিকের জীবন তাই অনেকটা দায়িত্ব আছে, কিন্তু জীবিকার নিশ্চয়তা নেই—এমন এক কঠিন বাস্তবতার নাম।
‎
‎দেশপ্রেম, পেশাগত নৈতিকতা, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সমাজের অনিয়ম-অসংগতি তুলে ধরার তাগিদ থেকেই অনেকে বছরের পর বছর কাজ করে যান। কিন্তু শুধু দেশপ্রেম দিয়ে সংসারের বাজার চলে না, সন্তানের পড়াশোনার খরচ মেটে না, চিকিৎসার ব্যয় বহন করা যায় না, কিংবা প্রতিদিনের যাতায়াত ও সংবাদ সংগ্রহের খরচও নির্বাহ করা সম্ভব হয় না।
‎
‎সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা হলো—যে সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহ করতে নিজের অর্থ ব্যয় করেন, তাঁর সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তাও অনেক সময় থাকে না।
‎
‎একজন মফস্বল সাংবাদিককে একটি সংবাদ সংগ্রহ করতে ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে জেলা শহর কিংবা প্রত্যন্ত কোনো গ্রামে যেতে হয়। যাতায়াত, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ক্যামেরা, মোটরসাইকেলের জ্বালানি—প্রায় সব খরচই বহন করতে হয় নিজের পকেট থেকে। অথচ মাস শেষে অনেকের হাতে আসে না কোনো বেতন।
‎
‎এর ফলে সাংবাদিকতার ওপরও এর সরাসরি প্রভাব পড়ে। আর্থিক সংকটে থাকা একজন সাংবাদিক সবসময় নিজের পেশাগত দায়িত্বকে সর্বোচ্চ সময় ও শ্রম দিয়ে পালন করতে পারেন না। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে তাঁকে অন্য কাজের দিকে মনোযোগ দিতে হয়। ফলে সংবাদ সংগ্রহ, অনুসন্ধান ও জনস্বার্থের বিষয়গুলো অনেক সময় পিছিয়ে যায়।
‎
‎আরেকটি অস্বস্তিকর বাস্তবতাও রয়েছে। নিয়মিত বেতন না থাকায় কোনো কোনো সাংবাদিক সম্মানী, বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিগত সুবিধা কিংবা বিভিন্ন পক্ষের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। এতে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও বস্তুনিষ্ঠতা প্রশ্নের মুখে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা কখনো কখনো একজন সাংবাদিকের পেশাগত নীতিবোধকে নয়, বরং তাঁর কাজ করার সক্ষমতাকেই দুর্বল করে দেয়।
‎
‎তাই মফস্বল সাংবাদিকদের আর্থিক দুরবস্থাকে শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি গণমাধ্যমের কাঠামোগত সমস্যা। কারণ রাজধানী কিংবা বড় শহরের সংবাদকেন্দ্রগুলোতে বসে যে সংবাদ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়, তার একটি বড় অংশের ভিত্তি তৈরি করেন এই মফস্বল সাংবাদিকরাই।
‎
‎তাঁদের শ্রমের ওপর সংবাদমাধ্যম দাঁড়িয়ে থাকবে, অথচ তাঁদের জীবনের ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা থাকবে না—এ বৈপরীত্য দীর্ঘদিন চলতে পারে না।
‎
‎মফস্বল সাংবাদিককে করুণা নয়, পেশাগত মর্যাদা ও ন্যায্য আর্থিক স্বীকৃতি দিতে হবে। সংবাদমাধ্যম কর্তৃপক্ষের উচিত তাঁদের জন্য বাস্তবসম্মত সম্মানী, যাতায়াত ও সংবাদ সংগ্রহ ব্যয় এবং অন্যান্য পেশাগত সুবিধার কাঠামো তৈরি করা।
‎
‎কারণ একজন সাংবাদিক যখন নিজের পকেটের টাকা খরচ করে মানুষের কথা তুলে ধরেন, তখন তাঁর শ্রমকে শুধু ‘দেশপ্রেম’ দিয়ে মূল্যায়ন করা যথেষ্ট নয়। দেশপ্রেম দায়িত্ব পালনের প্রেরণা হতে পারে; কিন্তু একজন মানুষের জীবিকা ও শ্রমের বিকল্প হতে পারে না।
‎
‎মফস্বল সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে সত্যিই যদি ভাবতে হয়, তাহলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—যাঁরা প্রতিদিন অন্যের খবর তুলে ধরছেন, তাঁদের নিজের জীবনের খবর কে রাখছে?

 

(‎মাঈন উদ্দিন সরকার রয়েল)
‎